in

আমাদের ভবিষ্যৎ কি হুমকির মুখে?

আমাদের জীবনে সমস্যার কোনো অভাব নেই। ব্যক্তিগত সমস্যা বাদ দিয়েও আছে বৈশ্বিক নানা সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তন, সমতার অভাব, লিঙ্গ বৈষম্য, গণতন্ত্রের অভাব- এমন আরো অনেক দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে এখন ভাবছি আমরা। সেই সাথে এখন ডিজিটাল যুগের অংশ হিসেবে যোগ দিয়েছে প্রযুক্তির নানা নেতিবাচক প্রভাবও। না, শিশু-কিশোরদের উপরে মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রভাব নিয়ে নয়, আজকের এই লেখা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবর্গ নিয়ে।

সাইবর্গ ব্যাপারটি নিয়ে এমন চিন্তা করাটা আপনার কাছে হাস্যকর মনে হতেই পারে। চলচ্চিত্রে, কল্পকাহিনীতে সাইবর্গ মানায়, এমনটা ভাবা স্বাভাবিক। তবে কেমন হবে, যদি এই সাইবর্গ সত্য হয়ে যায়? সৈন্যদের মস্তিষ্কে ইলেকট্রনিক ডিভাইস স্থাপনের মাধ্যমে তাদেরকে সাইবর্গ ওয়ারিয়র বানিয়ে তোলার পদ্ধতিটি যুদ্ধ ভালোবাসে এমন কোনো শক্তির জন্য বাস্তবে প্রয়োগ করাটা কঠিন কিছু কিন্তু নয়।

ইন চিপ সৈন্যদের মস্তিষ্ককে নিজেদের অস্ত্রের সাথে জুড়ে দিতে সাহায্য করবে; Image Source: wallpaperup.com

ব্যাপারটি যে শুধু এখন নতুন করে ভাবা হচ্ছে তা নয়। অনেক আগে থেকেই সাইবর্গ ওয়ারিয়র নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা কথা বলছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের পত্রিকায় এ নিয়ে লেখা হচ্ছে বেশি। এমনটা হলে এর খারাপ প্রভাব আর কতটাই বা পড়তে পারে? ইতোমধ্যে অনেক এজেন্সিই এমন কিছু চেষ্টা করে চলেছে। যার অন্যতম বড় একটি অংশ হচ্ছে মস্তিষ্কে ব্রেইন চিপ প্রবেশ করানো। এই চিপের মাধ্যমে একটি স্নায়ু অন্য স্নায়ুর সাথে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ আদানপ্রদান করতে ও যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়।

এক্ষেত্রে ডারপা বা ডিফেন্স অ্যাডভান্স রিসার্চ প্রোজেক্ট এজেন্সি এই ব্রেইন চিপ ব্যবহার করে পোষা প্রাণীদের ক্ষেত্রে। এই চিপের মাধ্যমে প্রাণীরা নিজেদের হারিয়ে যাওয়া অঙ্গের স্থানে বসানো যান্ত্রিক অঙ্গকে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। তবে এই সামান্য প্রচেষ্টা থেকেই অনেক নতুন ব্যাপার শিখছে এজেন্সিটি। যার ফলে তারা এখন ভাবছে মানুষকে এমন কিছু শক্তি দেওয়ার যে শক্তি মানুষ প্রাকৃতিকভাবে, জন্ম থেকে অর্জন করেনি।

মস্তিষ্কে কোনো ইলেক্ট্রোড প্রবেশ করানো হলে সেটি কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যে নিজের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে; Image Source: i.ytimg.com

সোজাসুজি বলতে গেলে, ব্রেইন চিপ সৈন্যদের মস্তিষ্ককে নিজেদের অস্ত্রের সাথে জুড়ে দিতে সাহায্য করবে। মস্তিষ্কের মাধ্যমেই সরাসরি, শুধু চিন্তা করেই অস্ত্র পরিচালনা করতে সক্ষম হবে এক্ষেত্রে সৈন্যরা। ব্যাপারটি অনেকটা ম্যাট্রিক্স চলচ্চিত্রে দেখা নিও চরিত্রটির মতো। যেসব মানুষের মন এই ব্রেইন চিপ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করবে, তাদেরকে অন্যরাও পড়তে ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।

তবে এক্ষেত্রে আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, মস্তিষ্কে কোনো ইলেক্ট্রোড প্রবেশ করানো হলে সেটি কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যে নিজের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাই এখনো মস্তিষ্ককে পুরোপুরি বোঝা, মস্তিষ্কের কার্যক্রমকে জানা এবং সেখানে সঠিক ও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য নতুন চিপ তৈরি করা- এই সবটাই অনেক দূরের ব্যাপার। কোনো একদিন হয়তো এই ব্যাপারটি সফলতা লাভ করবে। তবে সেই দিনটি এখনো অনেক দূরে।

প্রথম এই ব্রেইন চিপ ব্যবহার করেন জোস ডেলগাডো; Image Source: spectrum.ieee.org

অন্যদের মতো লেখক রাফি কাচাদোউরিয়ান ‘দি নিউ ইয়র্কার’এ এ সম্পর্কে লেখেন। এক্ষেত্রে তিনি গবেষক অ্যান্ড্রু স্কোয়ার্টজের কার্যক্রমের উপরে দৃষ্টি দেন এবং এর মাধ্যমে মস্তিষ্কে যন্ত্র স্থাপনের ভালো দিকগুলোর সাথে সাথে সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাগুলোকেও ফুটিয়ে তোলেন। ২০১২ সালে স্কোয়ার্টজ একজন পক্ষাঘাতগ্রস্থ মানুষের শরীরে যন্ত্র স্থাপন করেন। যেখানে নিজের মনের ইচ্ছার মাধ্যমে নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে রোগী একটি চকোলেট বার খেতে সক্ষম হন।

তবে এই যান্ত্রিক এই অঙ্গের উপরে খুব একটা ভরসা করা যায় না বলে মনে করেন রাফি। কারণ চকোলেট বারে প্রথম কামড় ঠিকভাবে দিতে পারলেও পরের কামড়টি দেওয়ার আগেই হাত খানিকটা সরে যায়। পরবর্তীতে এই যন্ত্রটি ব্যক্তির খুলিতে চাপ প্রদান করছিল। তাই মস্তিষ্কের কোনো সংক্রমণ হওয়ার আগেই সেটিকে অপসারণ করে নেওয়া হয়। তবে এই পুরো ব্যাপারটি জানার পর ডারপা সেটিকে সামিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে নিজের চিন্তার মাধ্যমে মানুষ F-35 flight simulator নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।

পরবর্তীতে স্কোয়ার্টজ ডারপা থেকে আলাদা হয়ে গেলেও ডারপা এই গবেষণা চালু রাখেন। মনের সাহায্যে ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রচুর টাকা খরচ করে গবেষণা চালানো হয়। প্রথম এই ব্রেইন চিপ ব্যবহার করেন জোস ডেলগাডো। ১৯৭২ সালে তুলানের রবার্ট হেথ এই কাজে সক্ষম হন। হতাশা ও মানসিক নানা অসুখের প্রতিকারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। তাতে অবশ্য খুব বেশি লাভ হয়নি।

বর্তমানে কানে না শোনা এবং অন্যান্য নানা শারীরিক সমস্যার সমাধান হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করার সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে। যেটি শুধু চিকিৎসকেরা নন, সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়েছে ফেসবুক, গুগল এবং ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরোলিংকসহ সিলিকন ভ্যালির আর অনেক প্রতিষ্ঠান। সত্যিই, হাত ব্যবহার না করে শুধু চিন্তা করেই সবকিছু পরিচালনা করার ব্যাপারটি শুনতে ভালোই লাগে, তাই না?

চিন্তার মাধ্যমে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সেটা যুদ্ধকে আরো বিধ্বংসী করে তুলবে; Image Source: cdn.shopify.com

ব্যাপারটি কিন্তু এত সহজ নয়। ইতিমধ্যেই সামরিক বিশেষজ্ঞরা এই স্নায়বিক অস্ত্রের প্রভাব যুদ্ধের উপরে কতটা বাজেভাবে পড়তে পারে তা নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন। ভাবাটা অযৌক্তিক না। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। একে আটকানো সম্ভব নয়। তবে কেবল চিন্তার মাধ্যমে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সেটা যুদ্ধকে আরো বিধ্বংসী করে তুলবে।

যেখানে একটি যুদ্ধ হয়তো সামান্যতেই শেষ হয়ে যেত, সেখানে এমন কোনো ভয় আর থাকবে না। সাইবর্গ ওয়ারিয়রদের অবশ্যই হারানোর খুব বেশি কিছু থাকবে না। তারা হবে মানব রোবোট। সবচাইতে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, ব্যাপারটি একটি দুঃস্বপ্নের মতো হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুঃস্বপ্নটি একদিন সত্য হয়ে যাবে!

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments