in

চিন্তাকে কথায় প্রকাশ করবে যে যন্ত্র

কেমন হতো, যদি চিন্তা করলেই সেটা ভাষায় বদলে যেত? নিশ্চয়ই ভাবছেন, এমন অলস কয়জন আছে যে কথা বলতেও পছন্দ করে না? কথা বলা আর না বলার ব্যাপারটি শুধু ইচ্ছার উপরে নির্ভর করে না। আরো অনেক কারণেই মানুষ নিজের চিন্তাগুলোকে কথায় প্রকাশ করতে অক্ষম হতে পারে। অনেক সময় আবার ইচ্ছাই করে না মুখ ফুটে কোনো কথা বলতে। সম্প্রতি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী এই সমস্যাগুলোর সমাধান হিসেবেই এমন এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার চেষ্টা করেছেন যেটি মানুষের চিন্তার প্রক্রিয়াকে কথায় রুপান্তরিত করতে সক্ষম। স্পিচ সিন্থেসাইজার্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে এই কাজটি করেছে তারা।

ভোকোডার; Image Source: i1.wp.com

এই প্রযুক্তিতে আমাদের মস্তিষ্কের সাথে সংযোগ স্থাপন করা হয়। এরপর মস্তিষ্কের কার্যক্রমের দিকে নজর রেখে সেটাকে শব্দে বদলে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুসারে, এই নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ব্যবহার ও ক্ষমতা সীমিত। তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আর বড় আকারে এবং বিশদভাবে কাজে আসতে পারে।

প্রথমত, এটি একটা সময় কম্পিউটারের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে আমাদের অনেক বেশি সাহায্য করতে পারে। অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে, যেমনটা কিছুটা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে, কথা বলতে সমস্যা বোধ করেন এমন মানুষদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিটি অনেক বেশি ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। বিশেষ করে, যেসব ব্যক্তি স্ট্রোক বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে কথা বলতে পারছেন না বা জড়তা বোধ করছেন, তাদের জন্য এটি অনেক বেশি সাহায্যকারী পদ্ধতি। খুব সহজ উদাহরণ হিসেবে এখানে স্টিফেন হকিং-এর কথাই বলা যায়।

এর আগেও এমন কিছু তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে ; Image Source: cdn.vox-cdn.com

আমরা যখন কথা বলি বা কথা বলার ব্যাপারে ভাবি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চল আলোকিত হয়ে ওঠে। ঠিক একইভাবে, যখন আমাদের সামনে কেউ কথা বলে সেটা শুনলে আমাদের মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট গঠনে আলোড়ন তৈরি হয়। চিন্তাকে কথায় রুপান্তরিত করার এই প্রক্রিয়াটি মূলত ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এর আগেও এমন কিছু তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে সেসময় মস্তিষ্কের কার্যক্রম বোঝার জন্য স্পেক্টোগ্রাম-অ্যানালাইজিং কম্পিউটার মডেলের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। বলাই বাহুল্য যে, এই পদ্ধতি কাজে আসেনি। এমন কিছু তৈরি করা সেসময় সম্ভব হয়নি। তবে এবার নতুন পদ্ধতিতে এগিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অ্যাপল সিরি এবং অ্যামাজন অ্যালেক্সা তৈরিতে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি ভোকোডার ব্যবহার করেছে, সেটাই এবার নতুন এই প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

এর জন্য শুধু দরকার হয়েছিল একটি ভোকোডার এবং শক্তিশালী স্নায়বিক নেটওয়ার্কের ; Image Source: cdn1.medicalnewstoday.com

ভোকোডারস এমন একটি কম্পিউটার অ্যালগরিদম, যেটি মানুষের ভাষাকে নানারকম প্রক্রিয়ায় বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। তবে এজন্য অবশ্য একে মানুষের কথোপকথন নিয়ে প্রশিক্ষন দিতে হয়। আর সেটা করা হয় মানুষের কথা দিয়ে তৈরি রেকর্ডিং-এর মাধ্যমে। এই পুরো পরীক্ষাটি পরিচালিত হয় কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্টিমার বি জাকারম্যান ব্রেইন বিহেভিয়ন ইন্সটিটিউটের প্রধান ইনভেস্টর নিমা মেসগারানি।

এতে ভোকোডারকে প্রশিক্ষণ দিতে পাঁচজন এপিলেপ্সি রোগীর সাহায্য নেওয়া হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেরই মস্তিষ্কের অপারেশন হয়ে গিয়েছিল। তাই তাদের জন্য কাজটি করা অনেক বেশি সহজ ছিল। এই রোগীদের বলা হয় বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন কথা শুনতে। তাদের এই কথা শোনার পর্যায়ে মস্তিষ্কের পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়। আর ঠিক এর পরেই মূল পরীক্ষাটি শুরু করা হয়। আসলেই এই প্রক্রিয়াটি কাজ করে কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্য অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ যন্ত্রকে দিয়ে পরানো হয়। রেকর্ডিং চালু করা হয় এবং সেই অনুযায়ী যন্ত্র পঈক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ ০ থেকে ৯ সংখ্যার মধ্যে ধারণ করতে সক্ষম হয়। এরপর ভোকোডারের সেই রেকর্ডিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা পরিষ্কার করা এবং গ্রহন করা হয়।

এর ফলাফল হিসেবে শেষমেশ সংখ্যা অনুযায়ী একটি ধাতব স্বর যন্ত্র দিয়ে শোনা যায়। আসলেই এই ভোকোডার কতটা সঠিকভাবে নিজের কাজ করতে পেরেছে তা বোঝার জন্য অংশগ্রহণকারীদের সেটা শোনানো হয় এবং বলা হয় তারা যেটা শুনেছে সেটা বলতে।  আর এতে করে দেখা যায় যে, মানুষ এই শব্দের শতকরা ৭৫ শতাংশ বুঝতে সক্ষম হচ্ছে। আগে এ নিয়ে করা অন্যান্য পরীক্ষার চাইতে কয়েকগুণ ভালো ফলাফল ছিল এটি। আর এর জন্য শুধু দরকার হয়েছিল একটি ভোকোডার এবং শক্তিশালী স্নায়বিক নেটওয়ার্কের। ফলাফলের এই চমৎকার নির্ভূলতা অবাক করে দিয়েছিল বিজ্ঞানীদের।

মানুষ একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করার জন্য ভাষার ব্যবহার করতে বাধ্য; Image Source: www.medicaldevice-network.com

তো, এর পরের ধাপটি কী? গবেষকেরা আরো ভালোভাবে এই পুরো প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার জন্য পরবর্তীতে পুরো একটা বাক্য যেন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বলা সম্ভব হয় সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করহচেন। কিন্তু, বাস্তবে ঠিক কতটা সাহায্য করবে প্রযুক্তিটি? আসলেও কি ‘আমি এক গ্লাস পানি পান করতে চাই’এর মতো লম্বা একটি বাক্য কি যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব হবে?

এখন নতুন এই প্রযুক্তিটি যতটা অগ্রগতি সাধন করেছে সেটিও কম নয়। মানুষ একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করার জন্য ভাষার ব্যবহার করতে বাধ্য। তাই অবশ্যই যতটা এখন এই পদ্ধতিটি মস্তিষ্কের মাধ্যমে কথা বলার ব্যাপারটি বাস্তবে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে, সেটা অনেকটাই বেশি মানুষের জন্য। আর পরবর্তী সাফল্য? সেটাও হয়তো আর খুব বেশি দূরের কথা নয়, যেদিন মানুষ চিনাকে যন্ত্রের ভাষায় খুব সহজেই প্রকাশ করতে পারবে। অপেক্ষাটা সেই দিনেরই।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments