in

যেসব সাই-ফাই চলচ্চিত্রের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হয়েছে

চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে সায়েন্স ফিকশন তুমুল জনপ্রিয় একটি ঘরানা। এ ঘরানার ছবিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পঞ্চাশ-একশ বছর পরের পৃথিবীর বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়। অধিকাংশ ভবিষ্যদ্বাণীই সাধারণত ফলে না, বরং চরম হাস্যকর প্রমাণিত হয়।

যেমন ১৯৮৭ সালের ছবি ‘দ্য রানিং ম্যান’ এ দেখানো হয়েছিল, ২০১৯ সালে নাকি টেলিভিশনে সরাসরি ব্যাটল-রয়্যাল স্টাইলের খুনোখুনি দেখানো হবে। বাস্তবে কি তেমন কিছু ঘটছে? ঘটছে না। আবার ‘দ্য আইল্যান্ড’ ছবিতে বলা হয়েছিল, ২০১৯-ই নাকি হবে সেই বছর, যখন বিভিন্ন খামারে পশুপালনের মতো করে হিউম্যান ক্লোন পালা হবে তাদের বিভিন্ন অঙ্গ সংগ্রহের জন্য। মজার ব্যাপার হলো, ছবিটি মাত্র ১৪ বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, সায়েন্স ফিকশন ঘরানার ছবিতে এমন অনেক অদ্ভুতুড়ে ভবিষ্যদ্বাণীই করা হয়, বাস্তবের সাথে যেগুলোর বিন্দুমাত্র যোগসূত্র নেই। আবার অনেক সময় এর ব্যতিক্রম ঘটনাও কিন্তু ঘটতে দেখা যায়। হয়তো বহু পুরনো কোনো একটি ছবিতেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক এমন কিছু একটা দেখানো হয়েছিল, যা এখন নিরেট বাস্তব। এখন আপনাদের সামনে তুলে ধরব সেরকমই কিছু পুরনো, ধ্রুপদী সাই-ফাই ছবির কথা, যেগুলোতে প্রদর্শিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণী খানিকটা দেরিতে হলেও সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

লে ভোয়্যাজে দান্স লা লুন; Image Source: Art.com

মহাকাশ ভ্রমণ — লে ভোয়্যাজে দান্স লা লুন, ১৯০২

মহাকাশ ভ্রমণ নিয়ে প্রচুর গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত বহু চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সেই ১৮৬৫ সালেই জুল ভার্ন লিখেছিলেন ‘ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন’ উপন্যাসটি। তারপরও পর্দায় মহাকাশ ভ্রমণকে তুলে ধরার জন্য ১৯০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লে ভোয়্যাজে দান্স লা লুন’ নামক ফরাসি ছবিটির কথা বলতেই হয়।

মুভি ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়েছে মাত্র ১০ বছর আগে। প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে আরো তিন বছর পর। অথচ সেই তখনই ফরাসি নির্মাতা জর্জ মেলিয়েস তৈরি করেছিলেন ১৩ মিনিটের, স্পেশাল-ইফেক্ট সমৃদ্ধ এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি, যেখানে স্পেস ক্যাপসুলে করে চন্দ্রগামী একদল নভোচারীর কাহিনী তুলে ধরা হয়েছিল।

মেট্রোপলিস; Image Source: Wikimedia Commons

রোবটস — মেট্রোপলিস, ১৯২৭

মূলধারার চলচ্চিত্র দর্শকরা এই ছবিটির কথা হয়তো আগে শোনেননি, কিন্তু সাই-ফাই ভক্তরা অবশ্যই শুনেছেন, এবং সম্ভবত দেখেছেনও (কারণ ইউটিউবে রয়েছে পুরো ছবিটি)। নির্বাক, সাদা-কালো, দুই ঘন্টার উপর ব্যাপ্তির এই ছবিটিতে এক বিজ্ঞানীর কাহিনী দেখানো হয়েছিল, যিনি একটি ধাতব হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করেন এবং পরবর্তীতে সেটিকে ছবিরই আরেক চরিত্র মারিয়ার চেহারা দেন।

ফারেনহাইট ৪৫১; Image Source: Universal Pictures

ইয়ারবাডস — ফারেনহাইট ৪৫১, ১৯৬৬

রে ব্রাডবারির বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফারেনহাইট ৪৫১’ দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্কুলে পাঠ্য হিসেবে ছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে ফ্র্যাঙ্কোয়েস ট্রুফাটের হাত ধরে মুক্তি পায় সেটিরই চলচ্চিত্র সংস্করণ। এই ছবির মূল কাহিনীর সাথে হয়তো বাস্তবতার খুব বেশি সামঞ্জস্য নেই, তবে এখানে প্রদর্শিত ইয়ারবাড কিন্তু এখন আমাদের বর্তমান প্রযুক্তিগত সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশেই পরিণত হয়েছে।

১৯৬৬ সালেও পৃথিবীতে হেডফোনের অস্তিত্ব ছিল বটে, কিন্তু সেগুলো ছিল আকৃতিতে বিশাল। এই ছবির কাহিনীকার ও পরিচালকই প্রথম পরিচয় করিতে দেন ছোট আকৃতির ইয়ারবাডের সাথে, যা দিয়ে ব্যক্তিগত রেডিওতে গান শোনা বা কারো সাথে কথা বলা দুই-ই সম্ভব। ২০০১ সালে অ্যাপল আইপডের মাধ্যমে এ প্রযুক্তি বাস্তব জগতে পূর্ণতা পায়।

২০০১: আ স্পেস ওডিসি; Image Source: Wikipedia

স্কাইপ — ২০০১: আ স্পেস ওডিসি, ১৯৬৮

বিশ্ববিখ্যাত এই ছবিটিতে কী কী ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা নিয়ে আস্ত একটি আর্টিকেলই লিখে ফেলা যায়। এবং আসলেই, ইন্টারনেট ঘেঁটে সেরকম বেশ কিছু আর্টিকেল আপনি খুঁজে বের করতেও পারবেন। ট্যাবলেট কম্পিউটার থেকে শুরু করে মহাকাশ পর্যটন, কী ছিল না এই ছবিতে! তবে এই ছবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী হলো ভিডিও কলিং, যে ধারণারই বাস্তব রূপ হলো মাইক্রোসফট পরিচালিত ভিডিও চ্যাট সার্ভিস, স্কাইপ। ভিডিও কলিং ফিচারটি বারবারই উঠে এসেছে এই ছবিতে, যেমন ড. হেউড ফ্লয়েড ভিডিও কলের মাধ্যমে স্পেস স্টেশন থেকে কথা বলতেন তার পরিবারের সাথে।

এই ছবির আরো একটি বিশেষ দৃশ্য হলো যখন ফ্লয়েড ক্রেডিট কার্ড সদৃশ কিছু একটা ভিডিওফোনে প্রবেশ করিয়ে কল শুরু করতেন। বলাই বাহুল্য, সেই ষাটের দশকে ক্রেডিট কার্ড ধারণাটি এখনকার মতো এত জনপ্রিয় বা পরিচিত ছিল না একদমই।

ডিমন সিড; Image Source: Cinema International Corporation

স্মার্ট হোমস – ডিমন সিড, ১৯৭৭

ইন্টারনেট অফ থিংস ধারণাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আজকাল। দরজা-জানালা, কফি মেকার কিংবা ওয়াশিং মেশিন, সবকিছুর সাথেই ইন্টারনেট সংযুক্ত করে দূরে বসে সেগুলোকে পরিচালনা করার মাধ্যমে স্মার্ট হোম গড়ে তুলছে অনেকে। তবে মজার ব্যাপার হলো, যখনো কেউ ইন্টারনেট অফ থিংসের নাম শোনেইনি, সেই তখনই ‘ডিমন সিড’ নামক সাই-ফাই-হরর ঘরানার ছবিটিতে দেখা মিলেছিল স্মার্ট হোমের।

এই ছবিতে দেখা গিয়েছিল একজন বিজ্ঞানীকে প্রোটিয়াস ফোর নামক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কম্পিউটার তৈরি করতে। শুরুতে সেটি ইতিবাচকভাবেই যাত্রা শুরু করেছিল, সারিয়ে তুলেছিল লিউকেমিয়া। কিন্তু কিছুদিন পর সেটি বিজ্ঞানীর স্ত্রীর প্রেমে পড়ে যায়, এবং ধীরে ধীরে ঘরের সকল প্রযুক্তি ও আধুনিক ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয়। একটি স্মার্ট গোমের মতোই, কম্পিউটারটি পরিচালনা করতে থাকে বাড়ির আলো, দরজা-জানালার লক, অ্যালার্ম সিস্টেম, ডোরবেল ইত্যাদি।

স্টার ট্রেক; Image Source: Paramount Pictures

মোবাইল ফোন — স্টার ট্রেক, ১৯৬৬

১৯৬৬ সালে একটি টিভি সিরিজ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ‘স্টার ট্রেক’, এবং তখন তিন বছর চলেছিল সেটি। এরপর ১৯৭৯ সালে বড় পর্দায় আসে এটি। যেহেতু একই সাথে এটি টিভি সিরিজ ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দুই ভূমিকাতেই এসেছিল, তাই এটিকে এ তালিকায় রাখা যেতেই পারে।

‘স্টার ট্রেক’ টিভি সিরিজে দেখানো হয়েছিল একটি ফ্লিপ-আপ গ্রিড অ্যান্টেনার পকেট কমিউনিকেটর, যা দিয়ে যেকোনো জায়গা থেকে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হতো। এটি দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মটোরোলার প্রকৌশলী মার্টিন কুপার, এবং তিনি তৈরি করেছিলেন ১৯৭৩ সালে প্রথম মোবাইল ফোনের নকশা। তার তৈরি করা প্রোটোটাইপ থেকেই উৎপাদিত হয়েছিল মটোরোলা ডায়নাট্যাক মডেলটি।

ব্লেড রানার; Image Source: Newsweek

ফ্লাইং কারস — ব্লেড রানার, ১৯৮২

রিড স্কটের এই ছবিটিতে এমন অনেক ভবিষ্যদ্বাণীই দেয়া হয়েছিল, যা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যেমন এই ছবিতে বলা হয়েছিল ২০১৯ সালের মধ্যেই সাপ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে, পুরোপুরি মানবসদৃশ অ্যান্ড্রয়েড আবিষ্কৃত হবে, লস অ্যাঞ্জেলেসে অবিরাম বৃষ্টি পড়বে, মহাকাশে উপনিবেশ স্থাপিত হবে, ইত্যাদি। তবে এগুলো কিছু এখনো বাস্তবে না হলেও, ভবিষ্যতে যে হবে না, তেমনটি বলা যাচ্ছে না। আর এই ছবির অন্যতম অসম্ভব প্রযুক্তি মনে হয়েছিল যে উড়ন্ত গাড়িকে, সেটি কিন্তু ইতিমধ্যেই সম্ভব বলে প্রমাণ করে দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিবিদরা।

টোটাল রিকল; Image Source: Original Film

সেলফ-ড্রাইভিং কারস — টোটাল রিকল, ১৯৯০

এই ছবিটিতে বেশ কিছু ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল স্মৃতি নিয়ন্ত্রক প্রযুক্তি, দেয়াল আকৃতির টিভি, নিয়মিত বাণিজ্যিকভাবে মঙ্গলগ্রহে বিমানযাত্রা, মঙ্গলপৃষ্ঠের নিচে এলিয়েনদের সুপারস্ট্রাকচার ইত্যাদি। সেগুলো কিছুই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বটে, তবে এখানে দেখানো হয়েছিল ড্রাইভারের আসনে একটি অ্যান্ড্রয়েড অবতার বসিয়ে চালিত গাড়িও, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত গাড়িরই একটি আদিম রূপ। ইতিমধ্যেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত গাড়ির প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়ে গেছে এবং খুব শীঘ্রই এসব গাড়ি বাজারে ছাড়তে চলেছে বিশ্বের শীর্ষ অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments