in

স্মার্টফোন যেভাবে প্রস্তুত করা হয়

মোবাইল ফোন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরুর পর থেকে এর প্রয়োজন পূরণের ক্ষমতা যে কতটুকু বিশালাকার ধারণ করেছে এ সময়ে এসে তা আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারছি। একসময় শুধু কল দেয়া আর কল গ্রহণ করার কাজেই একে ব্যবহার করা যেতো। দিন যত গড়িয়েছে, মোবাইল ফোনের কর্মক্ষমতা আরো বেড়েছে।

আইফোন তৈরি করা হচ্ছে; Image Source: entrackr

ছোটখাটো দেশলাইয়ের বাক্সের সমান আকারের সেলুলার ফোন থেকে থেকে শুরু করে এক ফুটের কাছাকাছি আকারের মোবাইল ফোনও আমরা পেয়েছি। কোনটি ফিচার ফোন, যেগুলোতে কেবল কথা বলা,রেডিওতে গান শোনা যায়, আর রাতে পথ চলার জন্য ফ্লাশলাইট সংযুক্ত থাকে।

বিভিন্ন আকারের স্মার্টফোন; Image Source: Gettyimages

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা পেয়েছি স্মার্টফোন। কী করা যায় না স্মার্টফোনে? এককথায় সব করা যায়। সব করা যাক বা না যাক, আমাদের পুরো দিনের বিশাল অংশটাই দখল করে নিয়েছে এসব স্মার্টফোন। চলতে-ফিরতে, কথা বলতে কিংবা খাবার খেতে বসেও আমরা মুখ গুঁজে পড়ে থাকছি স্মার্টফোনের দিকে।

স্মার্টফোনগুলো আসলেই বেশ চটপটে আর স্মার্ট। এটি নিজেই কখনো ডাকপিয়নের দায়িত্ব নিয়ে আমাদের খবর পৌঁছে দিচ্ছে অন্য কোথাও, কখনও হয়ে উঠছে সিনেমা হল, কখনও খেলার মাঠের ইজারা নিয়ে পূরণ করছে বিনোদনের সব চাহিদা। আপনার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ কিংবা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের দায়িত্বের পাশাপাশি দূর কোনো দেশের পথ দেখানোর জন্য মানচিত্র হাতে বসে আছে স্মার্টফোনগুলো।

বড় আকারের স্মার্টফোনগুলোকে আমরা পরিচিতি দিয়েছি ফ্যাবলেট, ট্যাবলেট প্রভৃতি নামে। বই-পত্রিকার বিকল্প অথবা মুভি দেখাতেও এরা বেশ পটু।আর সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার নাম করে আমরা অনায়াসেই সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারি স্মার্টফোনের সোশ্যাল কমিউনিকেটিং অ্যাপগুলোতে। এই যে মোবাইল ফোন আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছি, কখনও কি আমাদের মাথায় এরকম ভাবনা আসে, কিভাবে এই ঝকঝকে, চকচকে, কর্মক্ষম স্মার্টফোনগুলো আমাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছায়? আজ আমরা জানবো স্মার্টফোন তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া।

যখন কোনো কোম্পানি একটি নতুন মডেলের স্মার্টফোন বাজারে আনার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কাজ শুরু হয় মূলত তাদের পুরোনো মডেলের ফোনটি থেকে। তাদেরকে একেবারে নতুনভাবে কাজ শুরু করতে হয় না।বরং, এ ক্ষেত্রে যা করতে হয় তা হলো, পুরানো মডেলের ব্যবহারকারী এবং মোবাইল  বিশ্লেষকদের কাছ থেকে ফোনটির সকল সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি জেনে নিয়ে নতুন মডেলে তা কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা করা হয় এবং একই সাথে নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তি এতে সংযুক্ত করা হয়।

স্মার্টফোন নিচের ৬ টি ধাপে নির্মিত হয়:

১. প্রোটোটাইপ তৈরি

প্রোটোটাইপ বা আদিরূপ, Image Source: Microsoft

স্মার্টফোনের ডিজাইনটি বোর্ডের  সভায় গৃহীত হয় এবং তারপরে এটিকে গবেষণা ও উন্নয়ন ল্যাবের কাছে প্রেরণ করা হয়।  তাদের কাজ শুরু হয় মূলত প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক ডিজাইন দিয়ে। ফোনটিকে আকর্ষণীয়ভাবে ব্যবহারকারীর কাছে উপস্থাপনের বিষয়টিতেই তারা প্রথমে জোর দিয়ে থাকে। ল্যাবে চলে প্রোটোটাইপের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। এরপর কোম্পানিতে সরাসরি যুক্ত ডিজাইনাররা একে আকর্ষণীয় করে তুলতে তাদের মতামত প্রদান করেন। ডিজাইনের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর ভেতরের অংশের কাজে হাত দেয়া হয়।

স্মার্টফোনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ; Image Source: Fossbytes

এ পর্যায়ে মোবাইল ফোনটির ডিজাইন ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে প্রেরণ করা হয়। তারা মোবাইল ফোনটিতে কোন প্রসেসর এবং মেমরি ব্যবহৃত হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। ফোনের ডিসপ্লে এবং সম্ভাব্য ব্যাটারিও তারা নির্বাচন করেন। ক্যামেরা এবং খুঁটিনাটি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যুক্ত করে এর কর্মক্ষমতা লক্ষ করেন। এরপর যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দলটি , কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের সাথে সম্মিলিতভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তখনই ফোনটিকে অনুমোদনের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।

২. সফটওয়্যার সংযুক্তি

মোবাইল হ্যান্ডসেটের কায়া নির্মাণ অর্থাৎ হার্ডওয়্যার বা যন্ত্রপাতি সংযোজনের  পর প্রয়োজন হয় একে চলনশীল করে তোলা। সফটওয়্যার ছাড়া হার্ডওয়্যার পুরোপুরিভাবে হাতল বিহীন দা-কাঁচির মতো। বিষয়টি এরকম যে, সফটওয়্যার সংযুক্তি বা ইনস্টলেশনের মাধ্যমে মাটির পুতুল বা হার্ডওয়্যারে প্রাণ সঞ্চার করা হচ্ছে। পূর্ব-সিদ্ধান্তের আলোকে এতে অপারেটিং সিস্টেম সংযোজন করা হয়। প্রকৌশলীগণ কর্তৃক সংযুক্ত যন্ত্রপাতিসমূহ অপারেটিং সিস্টেমটি চালাতে সক্ষম কিনা এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। আশানুযায়ী মোবাইল সেটটি চলছে কিনা এ বিষয়টি বেশ কিছু পর্যায়ের প্রকৌশলী কর্তৃক নিরীক্ষণ করা হয়।

স্মার্টফোনে বিভিন্ন অপারেটিং সিস্টেমের ব্যবহার; Image Source: SlideShare

নকশা নির্বাচন,যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং সফটওয়্যার সংযোজনের পর সেটটিকে বানিজ্যিকভাবে তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়। এ পর্যায়ে এসে পূর্ববর্তী প্রোটোটাইপ বা  প্রারম্ভিক ডিজাইনে পরিবর্তন আনা অসম্ভব বলেই বিবেচিত হয়ে থাকে।

৩. পরীক্ষামূলক পর্ব

উৎপাদন কার্যক্রমের পূর্বে মোবাইল সেটটিকে কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং এর উপযুক্ততা প্রমাণের জন্য বিভিন্ন প্যারামিটারের সাহায্যে পরীক্ষা করা হয়। তারা ফোনটির যন্ত্রপাতি বা হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার উভয়টিকেই পরীক্ষা করা হয়। ড্রপ পরীক্ষা (কতটুকু উচ্চতা থেকে ফেললে ফোনটি অক্ষত থাকে), বেন্ড টেস্ট (স্বাভাবিকভাবে বাঁকানো যায় কিনা) এবং জল পরীক্ষা (কত মিটার পানির নিচ পর্যন্ত এর কার্যক্ষমতা থাকে) করা হয়।

৪. বাণিজ্যিক উৎপাদন

যখন প্রোটোটাইপটি পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়, তখন ফোনটি তৈরীর কিছু উপাদান নিজেরা কোম্পানিতে উৎপাদন করে এবং বাকি উপাদানগুলো আমদানি করা হয়ে  থাকে। এ পর্যায়ে ফোনটির বিভিন্ন তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি একই সাথে কোম্পানির জন্য লাভ বয়ে আনতে পারে কিংবা ক্ষতির কারণও হতে পারে। কেননা, এতে করে মোবাইল ফোনের ফিচার দেখে অনেক গ্রাহকরা আকৃষ্ট হতে পারেন অথবা সমালোচক ও বিশ্লেষকেরা এর খুঁত ও দূর্বলতা নিয়ে আলোচনা করার ফলে সেটটি জনপ্রিয়তা হারাতে পারে।

চীনের একটি কারখানায় ফোন উৎপাদন করা হচ্ছে; Image Source: Google

নির্মাতারা চাইলে তাদের ফোনটি নিজেরাই কোম্পানিতে বাণিজ্যিক ভাবে তৈরি করতে পারেন অথবা ওইএম (original equipment manufacturers) পদ্ধতিতে তারা অন্য কোম্পানির কাছে স্পেসিফিকেশন সরবরাহ করার মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে ফোন উৎপাদন করিয়ে নিতে পারেন।

৫.প্যাকেজিং

মোবাইল প্যাকেজিং এর সময় সাথে চার্জার, ইউএসবি ক্যাবল ইত্যাদি সাথে দেয়া হয়; Image Source: Stylus.com

হ্যান্ডসেট সব পরীক্ষা পাস করার পর, এটি প্যাকেজিং-এর জন্য পাঠানো হয়। আনুষাঙ্গিক যন্ত্র (চার্জার, হেডফোন, ওটিজি ক্যাবল) এবং ব্যবহারকারী ম্যানুয়াল বা নির্দেশনা সহ হ্যান্ডসেটটিকে প্যাকেজিং করা হয় এবং গ্রাহকদের নিকট পৌঁছানোর যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয় এবং শো-রুমগুলোতে প্রেরণ করা হয়।

৬. শিপমেন্ট বা সরবরাহকরণ

স্মার্টফোনের শো-রুম; Image Source: Geekturf

শিপমেন্ট হলো সর্বশেষ পর্যায়। সুদৃশ্য বাক্সে মোড়ানো এই  ফোনগুলি বিশ্বব্যাপী খুচরো বিক্রেতাদের কাছে প্রেরণ করা হয় এবং এই খুচরো বিক্রেতাদের কাছ থেকে আপনি পছন্দসই ফোনটিকে সংগ্রহ করে থাকেন।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments